মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা গতকাল যে ওলামা সম্মেলনে সম্মানিত আলেম-ওলামাদেরকে ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা ও মর্মবানীকে সাধারন মানুষ, বিশেষ করে যুবসমাজের কাছে পৌঁছে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন, চলমান বাস্তবতার প্রেক্ষিতে তা যেমন সময়োপযোগী তেমনি জরুরী। ইসলামের সত্যিকার শিক্ষাকে যদি আমাদের সমাজ যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে ও সেই অনুযায়ী চলতে পারত তবে এসব সমস্যার উদ্ভব হবার কোন কারনই থাকতনা। দুঃখের বিষয় সে অবস্থা নেই। একারনে তরুন সম্প্রদায়ের মধ্যে নৈতিক বুদ্ধিবৃত্তিক এক শুন্যতা সৃষ্টি হয়েছে। শৈশবে ধর্মীয় শিক্ষার অনুপস্থিতি, কিশোর ও তরুনদের মধ্যে নামকাওয়াস্তে ধর্মীয় বিষয় নামে এক ভাসা ভাসা ধারনা ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আর এ শুন্যতা পুরনেই ইসলাম সম্পর্কে অনেক ভ্রান্ত ধারনা তরুন সামজের মন-মগজে গেড়ে বসার সুযোগ পেয়েছে। এই ভ্রান্ত শিক্ষা তাদেরকে কিছু উগ্রবাদীর প্রকৃতপক্ষে ইসলামকে গভীরভাবে কলংকিত করার অসদুদ্দেশ্যকে কাজে পরিণত করার দিকে যেমন ঠেলে দিচ্ছে; তেমনি অপরদিকে আমাদের সমাজে মুক্তবুদ্ধি ও প্রগতিশীলতার নামে যা চলছে তাতে অপর একদলকে বিপরীতমেরুর দিকে ধাবিত করছে।
বিষয়টির সহজ ব্যাখ্যা হিসেবে বলা যায়, শৈশবে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার অভাব থাকলেও পিতা-মাতার কাছে শিশুরা অন্ততঃ ভাল-মন্দ কাজ যেমন মিথ্যা বলা, অপরকে কষ্ট দেওয়া, পরষ্পরকে গালি দেওয়া, মারামারি করা ইত্যাদি কাজগুলো না করার শিক্ষা পায়। এর পর কিশোর-তরুনরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে যতটুকু ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা পায় তার মধ্যে উপরোল্লিখিত মন্দ কাজগুলো থেকে বিরত থাকার শিক্ষার তো কিছুটা হলেও পায়। কিন্তু সমাজের মধ্যে ঐসব শিক্ষাকে কাজে লাগানোর মত পরিবেশ পরিস্থিতি সে খুঁজে পায় না। সে দেখে, যে বাবা-মা সৎ থাকার কথা বলেন তারা নিজেরা সৎ নন। তাদের উপার্জনের লিখিত বা জানা সীমা থাকলেও তাদের অলিখিত বা গোপন উপার্জনের সীমা নেই। এক্ষেত্রে বাবা-মাকে নৃশংসভাবে হত্যাকারী মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ঐশী এক মর্মান্তিক উদাহরন। কিশোর-তরুনরা যখন দেখে সমাজের নেতৃস্থানীয়গন অন্যকে ভাল ভাল কথা বললেও নিজেরা সে সবের বিপলীত কাজে সততঃ নিয়োজিত থাকেন। যে ওয়াদা করেন অবলীলায় তার খেলাফ করেন। যারা ঘুষ-দুর্নীতি-মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে কথা বলেন তারাই কেউ আড়ালে কেউ প্রকাশ্যে এসবের ব্যবসা-বানিজ্যে ফুলে ফেঁপে উঠছেন। যারা নীতি-নৈতিকতার কথা বলেন তারা জনগনের গাঁটের পয়সায় বেতনভাতা পেলেও উপরি ছাড়া কোন কাজ করেন না। (অল্প কিছুদিন আগে মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয় আক্ষেপ করে বলেছেন বেতনভাতা বাড়ালে দুর্নীতি কমার যে আশা করা গিয়েছিল সে আশা নিদারুনভাবে ভঙ্গ হয়েছে। অতি সম্প্রতি চট্টগ্রামের মাননীয় মেয়র মহোদয় স্বয়ং এই অভিযোগ করেছেন।) সর্বজনশ্রদ্ধেয় শিক্ষকগনও তাদের পূজ্নীয় আসন ছেড়ে দলীয় রাজনীতির পঙ্কে নেমে পড়তে অথবা নৈতিকতার চরম অধঃপতন ঘটিয়ে শিক্ষার্থীদের সাথে চরম অশালীন আচরন করেন এমনকি যৌন নিপীড়ন করতেও দ্বিধা করেন না f কিশোর-তরুনরা যখন দেখে যে, যে আলেম-ওলামাগন মানুষকে ঐক্যবদ্ধভাবে ইসলামের রজ্জুকে আঁকড়ে ধ’রে একত্রিত থাকার কথা ব’লে পবিত্র কোরআনের ’ওয়া তাসেমু বিহাবলিল্লাহে ওয়ালা তার্ফারাকু’- এই আয়াতের উদ্ধৃতি দেন তারাই ডজনাধিক ফেরকা তৈরী করে প্রায়শঃই বিবাদ-বিসম্বাদে লিপ্ত হন। দেশের শাসনকার্যের শিখরে যিনি বা যারা বসে আছেন তারা অবলীলায় প্রতিপক্ষকে শালীন অশালীন নানা বিশেষনে ভূষিত করে মাঠ গরম করে ফেলছেন। ভোটের সময়ে দেওয়া নানা রকম প্রতিশ্রুতি নির্বাচিত হবার পর বেমালুম ভুলে গিয়ে সম্পুর্ন উল্টো কায়-কারবার চালাচ্ছেন; জনগনের স্বার্থ রক্ষা চেয়ে নিজের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন। চাকরী-বাকরীর ক্ষেত্রেও তারা দেখে যে কেবল মেধা, যোগ্যতা ও আনুষঙ্গিক কোয়ালিফিকেশন নিয়ে মেধাতালিকার শীর্ষে থাকলেও কেবল দলীয় কর্মকান্ডে জড়িত নয় বা ট্যাঁকের জোর নেই বলে তাদের চাকরী হয় না। এভাবে তারা যখন তাদের শিক্ষার সাথে বাস্তবতার বিরাট ফারাক দেখে তখন তাদের মন-মগজ আর সঠিক ও যুক্তিযুক্ত পথে কাজ করে না।তখন এদেশে তাদের ভবিষ্যত সম্মন্ধে সম্পুর্ন হতাশ হয়ে তার তরুন মন-মানস বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। আর এর ফলশ্রুতিতেই সে যে কোন মোটিভেশনের কবলে পড়ে যায়। তখন তার দ্বারা যে কোন কাজ করানোয় আর বিশেষ অসুবিধা থাকে না।
যিনি বা যারা এই তরুন সমাজকে সঠিক পথে আনতে চান আগে তাদেরকেই আদর্শ ¯থাপন করতে হবে নিজ চারিত্রিক গুনাবলী ও কর্মকান্ডের মাধ্যমে। আজ আমাদের তরুনদের সামনে আইকন হিসেবে কারা আছেন? বা আদৌ আছেন কি? আমরা পরষ্পরকে গালাগালি দিতে দিতে, তাদের গায়ে কালি লাগাতে লাগাতে কাউকে তো আর নিষ্কলংক রাখিনি। তাই আজকের তরুন সম্প্রদায়কে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে আমাদের মুরুব্বীদের, নেতা-নেত্রীদের আমলা-ফয়লাদেরকে মোড়ল-মাতব্বরদেরকে আগে নিজেদের ঠিক করতে হবে। নইলে বাংলা আদর্শলিপিতে আমরা শৈশবে যে একটা কথা পড়েছিলামঃ পরকে উপদেশ দেয় নিজে নাহি মানে; সব চেয়ে বদ বেশী তারা এ ভুবনে - এ্ই কথাটা বাস্তবেই কার্যকর থাকবে।----- ১২/৮/২০১৬ইং